আনাড়ি টকিজ : পর্ব ২ : সাউন্ড ডিজাইনিং

Anari Talkies

আগের দিন ফলি নিয়ে কথা বলেছি, আজকে বলব শব্দের কার্যকারিতা নিয়ে। যে কোনও সিনেমাতেই শব্দ সাধারনত দুটো কাজ করে। তার মধ্যে একটা হল দর্শককে তথ্য জানানো, যাকে সাংবাদিকতার ভাষায় 5W1H বলে। কে, কোথায়, কবে, কেন, কী, কীভাবে – এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া। এটা কখনও সংলাপ দিয়ে করা হয়, কখনও ফলি দিয়ে করা হয়। যেমন ধরুন ড্যামিয়েন শ্যাজেলের বানানো সিনেমা ‘হুইপল্যাশ’ এর এই দৃশ্যটার শুরুতে সংলাপই বলে দিচ্ছে যে কী ঘটতে চলেছে। এই সংলাপের থেকে আমরা যা যা জানলাম তাকে বলতে পারি ‘আউটার ওরিয়েন্টেশন’। অর্থাৎ দৃশ্যটির বাহ্যিক ধারণা আমরা পেলাম।

কিন্তু শব্দের দ্বিতীয় কাজটা একটু প্রচ্ছন্ন। সেটা হল দর্শকের অনুভূতিকে জাগানো। এই অনুভূতিগুলো দর্শককে তৈরী করে পরের দৃশ্যের জন্য। দর্শককে সুযোগ দেয় অনুমান করার যে এর পরের দৃশ্যে কী হতে চলেছে। একে আমরা বলি ‘ইনার ওরিয়েন্টেশন’। যার মাধ্যমে আমাদের বঝানো হয় যে পর্দায় দেখতে পাওয়া চরিত্রের মনের ভিতরে কী চলছে। এই কাজটা কিছু কিছু সিনেমার ক্ষেত্রে চরিত্রকে দিয়েই বলিয়ে নেওয়া হয়, কখনও সেটা কিছুটা শুনতে নাটকের বিবেকের চরিত্রের মতো লাগে, আবার কখনও চরিত্ররা সোজাসুজি ক্যামেরার দিকে তাকিয়েই বলে দেন যেমনটা আমরা দেখি ‘হাউজ অফ কার্ডস’ এর চরিত্র ফ্র্যাঙ্ক আন্ডারউডকে অথবা ‘ফ্লিব্যাগ’ এ নামভূমিকায় অভিনয় করা ফিবি-ওয়েলার-ব্রিজকে। সিনেমার ভাষায় একে বলে ‘breaking the fourth wall’। সাউন্ড ডিজাইনিং এর এই কাজটা হল সব থেকে বেশি ক্রিয়েটিভ এবং একই সাথে সাবজেক্টিভ। এই দিয়েই দর্শককে ভয় দেখানো, হাসানো ,কাঁদানো অথবা রাগের বশবর্তী করে তোলা যায়।

কখনও আবহ ,কখনও ফলি আবার কখনও দুটো এক সাথে আপনাকে পর্দায় দেখতে পাওয়া চরিত্রের ইনার ওরিয়েন্টেশন বুঝিয়ে দেয়। যেমন এই দৃশ্যটি।

অ্যান্ড্রু নিজের ড্রাম বাজানোর কাঠি আনেনি। তাই ওর নির্দেশক টেরেন্স ওকে স্টেজে উঠতে দেবেন না। কাঠিগুলোকে ওর ফ্ল্যাট থেকে নিয়ে আসার জন্য ওর হাতে সময় আছে মাত্র ১০ মিনিট। অ্যান্ড্রু এবারে ভীষণ তাড়াহুড়োয় বেরিয়ে যায়, এটা বোঝানোর জন্য প্রথমে বেশ উঁচু মাত্রায় দ্রুত তালে জ্যাজ ড্রাম বাজানো হচ্ছে যেটা আবার থিম্যাটিকালি রিলেটেড কারণ অ্যান্ড্রু নিজেও জ্যাজ ড্রামার। সিনেমাতে এই প্রথম অফ স্ক্রিন মিউজিক বাজে, এখানে মিউজিকটা শুধু মাত্র দর্শক শুনতে পাচ্ছে, চরিত্র না। এর ব্যবহার এখানে পুরোপুরি আবহসঙ্গীতের মতোই। এর সাথেই খুব তাড়াতাড়ি অনেকগুলো ফলি খুব কম সময়ের মধ্যে জুড়ে দেওয়া হল, যেমন দরজা খোলা, ব্রেক কসা, ট্রাফিকের হর্ন। খুব কম সময়ের মধ্যে অনেকগুলো আলাদা আলাদা সাউন্ড, তাদের কোনটাই এক সেকেন্ডের বেশি শোনা যাচ্ছে না,শুরু হয়েই কেটে যাচ্ছে। আমরা যে শব্দ শুনে অভ্যস্ত তাদের সবই আসতে থেকে জোরে হয় তারপরে আবার ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। যেহেতু এই দৃশ্যের ক্ষেত্রে সেটা হচ্ছে না তাই এই তাড়াতাড়ি কাটগুলো একটা উৎকন্ঠা তৈরী করে দর্শকের মনে।

গাড়ি চালানোর সময়ই অ্যান্ড্রুর ফোন আসে এবং ও রেগে গিয়ে ফ্রাস্টেটেড অবস্থায় চেঁচামেচি করে ফোনটা রাখে। ততক্ষণে মিউজিকের গতি এবং লয় দুইই তুঙ্গে, আর ঠিক তখনই সব চুপ! একটা আওয়াজকে অনেকটা উঁচুতে নিয়ে গিয়ে হটাৎ থামিয়ে দেওয়া মানে দর্শককে একটা অপ্রত্যাশিত খারাপ কিছুর জন্য তৈরী করা। সাথে সাথেই একটা ট্রাক অ্যান্ড্রুর গাড়িকে ধাক্কা মারে এবং সব শব্দ বদলে যায়। অ্যান্ড্রুর তাড়াহুড়ো থমকে যায় অল্প সময়ের জন্য, কিন্তু তারপরেই কনকাশনের মুহূর্তটা পেরিয়ে যখনই অ্যান্ড্রুর মস্তিষ্ক আবার কাজ করতে শুরু করে আবার শুরু হয়ে যায় সেই ব্যস্ততা। এবারে আর ফলি নয়, এবারে শেষ দৌড়, তাই পুরোটাই করছে আবহ, সেই জ্যাজ মিউজিক।

হুইপল্যাশ শুধু সাউন্ড এফেক্ট, মিক্সিং বা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের জন্যই একটা মনে রাখার মত সিনেমা নয়। সিনেমাটার এডিটিং, শট ফ্রেমিং, লাইটিং, ক্যামেরার মুভমেন্ট সবকিছুই টেকনিকালি মারাত্মক স্ট্রং। তবে সেই গল্প আরেকদিন হবে না হয়।

দৃশ্যে আবহ আর ফোলির অবস্থান বোঝানোর জন্য একটা গ্রাফের ব্যবহার করলাম এবারে। দিলাম প্রথম কমেন্টে।

(আগের পর্বের লিঙ্ক ~ http://www.anariminds.com/2020/07/01/sound-design/ )

©এলজা রয়

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.