পুরনো কলকাতার বাজার – পর্ব ৩

পুরোনো কলকাতার বাজার

লেখক: অনিরুদ্ধ সরকার

শোভাবাজার:

শোভাবাজার বললে প্রথমেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ‘শোভাবাজার রাজবাড়ি’র ছবি আর শোভাবাজার রাজবাড়ি মানেই রাজা নবকৃষ্ণ দেবের কথা। পলাশীর যুদ্ধে নবকৃষ্ণ ইংরেজদের প্রচুর সহায়তা করেছিলেন নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে সিংহাসনচ্যুত করার জন্য। বাংলার শেষ নবাব সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন নবকৃষ্ণ। ১৯৫৬ সালে সিরাজউদ্দৌলা যখন কলকাতা আক্রমণ করেন ইংরেজরা সেসময় প্রাণরক্ষার তাগিদে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেন অন্যত্র। নবকৃষ্ণ সেখানে ইংরেজদের গোপনে ‘খাবার এবং খবর’ দুই-ই জোগান দিতেন। যোগাযোগ রাখতেন গোপনে। ফলে পলাশীর যুদ্ধের পরে ইংরেজদের যখন ভাগ্য ফিরল তখন নবকৃষ্ণেরও ভাগ্য সুপ্রসন্ন হল। লর্ড ক্লাইভ নবকৃষ্ণের ব্যবহারে অত্যন্ত প্রসন্ন হলেন। লর্ড ক্লাইভ নবকৃষ্ণকে সাহায্য করলেন এবং তাঁর চেষ্টাতেই নবকৃষ্ণ দিল্লির সম্রাটের কাছ থেকে মহারাজা বাহাদুর উপাধি এবং ৬০০০ মনসবদারি পদ লাভ করলেন। ১৭৬৬ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস তাঁকে সুতানুটির তালুকদারি দান করলেন। নবকৃষ্ণ উর্দু ও ফার্সি ভাষা বেশ ভালো জানতেন। হেস্টিংস যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কেরানী ছিলেন নবকৃষ্ণ তখন তাঁর ‘মুন্সী’ ছিলেন। হেস্টিংসের ফারসি ভাষার শিক্ষক ছিলেন নবকৃষ্ণ। কেউ কেউ অবশ্য বলেন অন্য কথা। সেসময় নকুড় ধর নামে এক ব্যক্তি অসাধারণ সঙ্গতিসম্পন্ন ছিলেন। ইংরেজদের কাছে তাঁর বেশ প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল। তিনিই নবকৃষ্ণকে ‘হেস্টিংসের মুন্সী’ করে দিয়েছিলেন। এজন্য নবকৃষ্ণকে লোকে ‘নব মুন্সী’ বলত। নবকৃষ্ণ আরবি ও ইংরেজি ভাষা শিখেছিলেন। তিনি লর্ড ক্লাইভেরও মুন্সী ছিলেন। মহারাজা বাহাদুর উপাধি পাওয়ার পর নবকৃষ্ণ সুসজ্জিত হাতির পিঠে চড়ে অশ্বারোহী-গজারোহী-পদাতিক-কবি বিরাট শোভাযাত্রা সহকারে শোভাবাজারে ফিরে এসেছিলেন। নিজের বাড়িতে তিনি গোবিন্দ ও গোপীনাথ বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ তো গেল শোভাবাজার রাজবাড়ি এবং তার প্রথম প্রতিষ্ঠাতা নবকৃষ্ণ দেবের কথা। এখন প্রশ্ন হল শোভাবাজার নামটি এসেছিল কোথা থেকে? পুরনো কলকাতার ঐতিহাসিক দলিল দস্তাবেজ ঘাঁটতে ঘাঁটতে জানা যায়— শোভাবাজার, সভাবাজার, সুবাবাজার এই তিন প্রকার নাম দ্বারা এই অঞ্চলটিকে নির্দেশ করা হয়েছে। সেকালে এই অঞ্চলে যে বাজারটি ছিল তাকে বলা হত ‘সুবাহবাজার’ অর্থাৎ বাংলার সুবাহ সরকার এ বাজার চালাতেন আর তাই পরবর্তীকালে নাম রূপান্তরিত হয়েছিল শোভাবাজার। তবে এই শোভাবাজার নামকরণের সঙ্গে জড়িত আরও একটি কাহিনির পরিচয় মেলে।
সেযুগে শোভারাম বসাক নামে এক ব্যক্তি এ অঞ্চলে বসবাস করতেন। জাতিতে তিনি ছিলেন তন্তুবাই। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে সুতো ও কাপড়ের ব্যবসা করে তিনি কোটিপতি হয়েছিলেন। ১৭৫৭ সালে ইংরেজরা সিরাজউদ্দৌলার কাছ থেকে কলকাতা পুনরুদ্ধার করার পর নবাব মীরজাফর দেশী প্রজাদের ক্ষতিপূরণের জন্য যে অর্থ প্রদান করেছিলেন তার প্রাপকদের মধ্যে শোভারাম ছিলেন অন্যতম। তিনি ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রায় চার লক্ষ টাকা পেয়েছিলেন। সেযুগে যা কোটি টাকার কাছাকাছি ছিল। কলকাতা বিষয়ক একাধিক গ্রন্থ থেকে জানা যায় রাজা নবকৃষ্ণদেবের রাজবাড়ির কাছাকাছি শোভারাম বসাকের একটি বিরাট উদ্যানবাটি ছিল। সেখানে নানা প্রকার শাক সবজি এবং ফল উৎপন্ন হত এবং সেখানেই তা বিক্রি হত কালক্রমে তা বাজারের আকার ধারণ করে এবং এই কারণেই তাঁর নামানুসারে এই জায়গার নাম হয় ‘শোভাবাজার’। হলওয়েল সাহেব যে সময় কলকাতার কালেক্টর ছিলেন সে সময় প্রকাশিত এক তথ্য থেকে জানা যায়, “শোভাবাজার তখন বেশ জমে উঠেছে।” ইংরেজ আমলের দলিল ঘেঁটে জানা যায়, ১৭৬৮ সালে কলকাতায় মোট ১৮ টি বাজারের অস্তিত্বের কথা জানতে পারা যায়। বাজারগুলি সবই ছিল কোম্পানি বাহাদুরের সম্পত্তি। যার মধ্যে শোভাবাজার ছিল অন্যতম এবং এই সমস্ত বাজারগুলির মধ্যে জমা ও খরচের যে ফিরিস্তি পাওয়া যায় তা ভাববার মত। শোভাবাজারের বাৎসরিক জমার পরিমাণ ছিল ২৭৫ টাকা।
শোভাবাজার মানেই এখন বাজার কম বরং রাজবাড়ির কথা বেশি আর শোভাবাজার রাজবাড়ি মানেই মহারাজ নবকৃষ্ণ দেবের দুর্গাপূজার কথা। লর্ড ক্লাইভ নবকৃষ্ণ দেবের দুর্গাপূজায় উপস্থিত থাকতেন। বংশপরম্পরায় দুর্গাপূজা শোভাবাজারের এক বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়েছিল। পরে রাজা রাধাকান্তদেবের আমলে রাজবাড়ী সংলগ্ন জমিতে একটি নাটমন্দির স্থাপিত হয়েছিল। এই নাট মন্দিরে বিভিন্ন সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। চিকাগো বক্তৃতার পর কলকাতায় স্বামী বিবেকানন্দ ফিরলে তাঁর নাগরিক সংবর্ধনা এই নাটমন্দিরেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এখানে এসেছেন বিদ্যাসাগর, প্রিন্স দ্বারকানাথ, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ থেকে আরম্ভ করে শ্রীরামকৃষ্ণ অবধি। রাজা রাজকৃষ্ণদেবের দুর্গাপূজায় বাঈজি নাচের যে আসর বসত তা নাকি সেকালের সেরা উপভোগ্য অনুষ্ঠান ছিল। জানা যায়, রাজা রাজা রাধাকান্তদেব একবার নাকি দৈনিক ২০০ টাকা ব্যয়ে দুর্গাপূজা উপলক্ষে মেম বাঈজীদের আসর বসিয়েছিলেন। ভাবা যায়! লর্ড মিন্টো সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

চিনাবাজার-মুরগিহাটা:

‘চিনাবাজার’ নাম শুনে বুঝতে পারছেন চিন দেশের যাবতীয় জিনিস এখানে সহজেই মিলত বলে জায়গার নাম হয়েছে চিনা বাজার। চিনা বাজারের অনেকখানি অংশই এখন ব্রেবোর্ন রোডের অংশবিশেষ। বাংলার গভর্নর ব্রেবোর্ণের নাম অনুসারেই এই রাস্তার নাম হয় ব্রেবোর্ণ রোড। এখন অবশ্য নাম বদলে হয়েছে ত্রৈলোক্য মহারাজ রোড। বিনয় ঘোষের ‘কলকাতা শহরের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, উনিশ শতকের প্রথম ভাগের মধ্যেই কলকাতা শহরে বহু রকমের বাজার গড়ে উঠেছিল। যার মধ্যে গ্রিফিন ৩৬টি বাজারের কথা বলেছেন কিন্তু তাঁর মতে কোনও বাজারই পুরনো চিনা বাজারের মত নয়। সাধারণ লোকে কলকাতা শহরে বাজার বলতে তখন চিনা বাজারকেই বোঝাত। কারণ দোকানদার এবং জিনিসপত্রের বৈচিত্র চীনা বাজারের মত আর কোনও বাজারে তখন ছিল না। টিরেটা আর ধর্মতলা বাজারে মাছ-মাংস তরিতরকারি ফলমূল মিলত এছাড়া বাকি সবকিছুই মিলত নতুন ও পুরনো চিনা বাজারে। এককথায় চিনা বাজারকে তখন এদেশীয় ছোট ব্যবসায়ী ও দোকানদারদের সবচেয়ে বড় বাজার বলা হতো এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে বাঙ্গালীদের সংখ্যা ছিল সেখানে সবচেয়ে বেশি। চিনা বাজারে হরেক রকম পণ্যদ্রব্যের মধ্যে বইয়ের আকর্ষণ কিন্তু কম ছিল না। বইয়ের দোকান অধিকাংশই ছিল বাঙ্গালীদের এবং তাতে তখনকার দিনের ভালো ভালো ইংরেজি সাহিত্য ও বিজ্ঞানের বই থাকতো। শেক্সপিয়ার, স্কট সহ একাধিক বিখ্যাত বিদেশি লেখকদের বই তখন চিনা বাজারে পাওয়া যেত। এমনকি বিদেশে সদ্যপ্রকাশিত বই, সাহিত্য কিম্বা বিজ্ঞানের যেকোনও বই চিনা বাজারে থাকত। পাঠকরা খোঁজ করলেই তা পেতেন। প্রাচীন চিনা বাজার সম্বন্ধে আরও একটি তথ্য পাওয়া যায় তা হল রেজকিওয়ালাদের কাহিনী। রেজকি-বিনিময়ের ব্যবসা করে সে সময় চিনা বাজারে অনেকেই জীবন ধারণ করতেন। চিনা বাজার-এর সাথে আরও একটি জায়গার নাম জড়িয়ে যায় সেই জায়গাটির নাম হল মুরগীহাটা। ক্যানিং স্ট্রিটের কাছেই একটি পর্তুগিজ গির্জা রয়েছে। যে গির্জাটির নাম ‘ক্যাথিড্রাল চার্চ অফ দ্যা হোলি চার্চ’। প্রাচীন কলকাতায় এই গির্জাটিকে বলা হতো একসময় ‘মুরগীহাটার গির্জা’। কেননা গির্জাটি যেখানে অবস্থিত একসময় সেই সে এলাকাটি মুরগীহাটা নামে পরিচিত ছিল। আসলে এখানকার বাজারে পর্তুগিজরা একসময় প্রচুর মুরগি বিক্রি করত সে কারণে জায়গার নাম হয়ে যায় মুরগীহাটা। ব্রাবন রোড ধরে বিবাদীবাগের কাছে কিছুটা এগিয়ে গেলেই এজরা স্ট্রিট। সেখানে আছে পার্সিদের একটি উপাসনা মন্দির।
মুরগীহাটা-চিনা বাজারের গল্প শেষ করব শরৎচন্দ্র পণ্ডিত ওরফে দাদা ঠাকুরের “কলকাতার ভুল” নামে একটি রচনার কয়েকটি লাইন দিয়ে —

“মুর্গীহাটায় চুপ করে যাই

কিনিতে রামপাখি।

দেখি সারি সারি স্টেশনারি

আসল জিনিস ফাঁকি।।

চিনে বাজারেতে ভাবতাম

চিনে থাকে খালি।

দেখি ঘরে ঘরে দোকান করে

যতসব বাঙালি।।”

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.