পুরনো কলকাতার বাজার – পর্ব ৪

পুরোনো কলকাতার বাজার

লেখক : অনিরুদ্ধ সরকার

নিউমার্কেট ও হগ মার্কেট:

ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির সিভিল সার্ভেন্টরা বেতন কম পেতেন বলে তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে নানান ধরনের ব্যবসায় লিপ্ত হতেন। পুরনো কলকাতার ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, লিণ্ডসে ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন উচ্চপদস্থ আধিকারিক। তাঁর নামেই একটি পথ লিণ্ডসে স্ট্রীট নামে পরিচিত। তিনি বছরে প্রায় ৬০-৭০ টা বাঘ হত্যা করে সরকারের কাছে পাঠাতেন এবং সেই জন্য মোটা অঙ্কের টাকা পেতেন। এছাড়া হাতি ধরে সেনা বিভাগের ব্যবহারের জন্য পাঠিয়েও তিনি প্রচুর অর্থ রোজগার করতেন। এই লিণ্ডসে স্ট্রিটেই একসময় কলকাতা মিউনিসিপ্যালিটি প্রতিষ্ঠিত হল। কলকাতা মিউনিসিপ্যালিটি প্রতিষ্ঠিত প্রথম বাজার ‘নিউমার্কেট’। কলকাতার পুলিশ কমিশনার চার্লস স্টুয়ার্ট হগ ছিলেন সেসময় কলকাতা মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান। তাঁর প্রচেষ্টায় সেখানে একটি বাজার গড়ে ওঠে যা ‘হগ মার্কেট’ নামে পরিচিত ছিল। পুরনো কলকাতার ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায় ১৮৭৪ সালের পয়লা জানুয়ারি এই হগ মার্কেটের উদ্বোধন হয়। মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের আরেক উচ্চপদস্থ আধিকারিক ছিলেন হেনরি হ্যারিসন। যাঁর নামে হ্যারিসন রোড।

যাই হোক এই মিউনিসিপ্যালিটি কর্পোরেশনে রূপান্তরিত হওয়ার পর ১৯২৪ সালে কলকাতা মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের প্রথম মেয়র ও ডেপুটি মেয়র হন যথাক্রমে চিত্তরঞ্জন দাশ এবং অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী হোসেন সোহরাওয়ার্দী। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু নিযুক্ত হয়েছিলেন মুখ্য কার্যনির্বাহকের পদে। পরে ১৯৩০ সালে সুভাষ চন্দ্র বসুও কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন।

নিউ মার্কেট। বাঙালির বড় আদরের জায়গা। বলা হয় একসময় খুঁজলে নাকি বাঘের দুধও পাওয়া যেত নিউমার্কেটে। কাঁচা আনাজ থেকে শুরু করে ব্র্যান্ডেড বিদেশি জিনিস সব মেলে এখানে। একটা সময় সরকারী কাজ আর ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য প্রচুর ইংরেজ বাস করত কলকাতায়। কিন্তু তাঁদের দৈনন্দিন কেনাকাটার জন্য সেরকম কোনও বাজার ছিল না। স্টুয়ার্ড হগ সাহেব তখন কলকাতা শহরের কমিশনার। তাঁর উদ্যোগেই ধর্মতলা পার্কস্ট্রিট অঞ্চলে শুরু হল বাজার তৈরির পরিকল্পনা। মার্কেট তৈরির জন্য জমির দাম বাবদ ২ লক্ষ টাকা এবং নির্মাণের খরচ বাবদ ২.৫ লক্ষ টাকা লগ্নি করা হয়। নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হল ম্যাকিনটোশ বার্ন কোম্পানিকে। রিচার্ড বেইন ছিলেন সেসময়ের নাম করা স্থপতি। তাঁকেই দায়িত্ব দেওয়া হল বাজারের নকশা তৈরির। ব্রিটেনের রেল স্টেশনের আদলে তৈরি এই বাজারে ৭ টি ভাগ রয়েছে। ১৮৭৩ সালে শেষ হয় নির্মাণ কাজ। নতুন বছরের প্রথম দিন অর্থাৎ ১৮৭৪ এর ১লা জানুয়ারি খুলে দেওয়া হয় নিউ মার্কেট। হগ সাহেবের নামে নাম রাখা হয় ‘স্যার স্টুয়ার্ট হগ মার্কেট’। লোকমুখে যা পরিণত হয় ‘হগ সাহেবের বাজার’এ। পরে নাম হয় ‘নিউ মার্কেট। তবে মূল ভবনে আজও জ্বলজ্বল করে হগ সাহেবের নাম।

টালিগঞ্জ:

সারা পৃথিবীতে এখন ‘হলিউড-বলিউড এবং টলিউড’কে সবাই একনামে জানে। টালিগঞ্জের নাম থেকেই ‘টলি’ কথাটি এসেছে। টালিগঞ্জের নাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে যখন এক ছায়াছবি ব্যবসায়ী কলকাতায় এলেন এবং মানুষকে ছায়াছবি দেখালেন। ছায়াছবি ব্যবসায়ীর নাম ম্যাডান। জাতিতে তিনি ছিলেন পার্শি। ম্যাডানের কলকাতায় ছায়াছবি প্রদর্শন সাফল্য পেল। ভারতের রাজধানী তখন কলকাতা। ম্যাডান কলকাতায় ছায়াছবি স্থাপনের ষ্টুডিও স্থাপন করলেন এই অঞ্চলে। টালিগঞ্জ সেসময় ছিল বন জঙ্গলে ভরা। পার্শি বণিক জেএফম্যাডান গুদামঘরের মত একটি ফ্লোর করে সেখানে স্টুডিও নির্মাণ করেছিলেন। ম্যাডান সাহেবের ষ্টুডিওটি গড়ে উঠেছিল টালিগঞ্জের উত্তর দিকে। উত্তর কলকাতায় তখন থিয়েটার বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। রূপসী অভিনেত্রীরা সবাই তখন থিয়েটারেই ব্যস্ত। ম্যাডান সাহেবের সাদাকালো ছায়াছবিতে অভিনেত্রীদের স্থান তখন নিয়েছিল ইঙ্গ ভারতীয়রা। আর সেই সুন্দরী তরুণীদের চলমান নির্বাক ছবি দেখতে দর্শকরা বিভিন্ন জায়গায় ভিড় জমাতে লাগল। ধীরেধীরে ম্যাডান সাহেবের যুগ শেষ হয়ে যায়। টালিগঞ্জ বাড়তে থাকে একের পর এক স্টুডিও সংখ্যা। কিছু বাঙালি ও মাড়ওয়াড়ি ব্যবসাদার এগিয়ে আসেন এই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি তৈরি করতে। ম্যাডান স্টুডিও পরিণত হয় ইন্দ্রপুরীতে। ইন্দ্রপুরীর মালিক কিছু দূরেই গড়ে তোলেন ইন্দ্রলোক। তারপর একে একে গড়ে ওঠে ভারত-লক্ষ্মী, রাধা ফিল্মস ইত্যাদি। বীরেন্দ্রনাথ সরকার গড়ে তোলেন বিখ্যাত নিউ থিয়েটার্স স্টুডিও। প্রতিভাধর অভিনেতা অভিনেত্রী এবং চিত্রপরিচালকদের মাস মাহিনায় আবদ্ধ করলেন তিনি। দেখতে দেখতে সারা ভারতের এক মায়াপুরী হয়ে উঠলো টালিগঞ্জ। বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের এক বিরাট ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে টালিগঞ্জের ইট-কাঠ পাথরের স্টুডিও গুলোতে।
ইতিহাসের পূর্বেও ইতিহাস রয়েছে। আমরা টালিগঞ্জ থেকে টলিউড হওয়ার গল্প তো শুনলাম কিন্তু টালিগঞ্জ নাম এল কী করে? এবার সেই ইতিহাস জানা যাক। সেযুগে রেলপথ স্থাপিত হওয়ার আগে প্রাচীন কলকাতার যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল পুরোপুরি নদীনির্ভর। যেকোনও স্থান বা জেলা থেকে কলকাতায় আসতে হলে নদীপথে ও বড় বড় নৌকা ছাড়া আসার আর কোন উপায় ছিল না। নদীপথে গোয়ালন্দে এসে সেখান থেকে হরিণঘাটা, ভাঙ্গড়, মালঞ্চ, রায়মঙ্গল, হরিণখোলা, গোসাবা, মাতলা ও সপ্তমুখী নদী পার হয়ে পশ্চিমে সাগরদ্বীপ পূর্বে মূল ভূখণ্ডের মধ্যবর্তী বড়তলা নদী পেরিয়ে কলকাতা থেকে ৭০ মাইল দক্ষিণে মাডপয়েন্ট নামক এক জায়গায় হুগলি নদীতে ঢুকে তারপর কলকাতায় আসতে হত। এই ঘুরপথে কলকাতা আসতে মানুষের সময় লাগত প্রচুর। তাছাড়া ভারী মালপত্র ও যাত্রী বোঝাই নৌকার পক্ষে সে পথ ছিল বেশ বিপদজনক। পুরনো কলকাতার ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায় সেযুগে বরিশাল থেকে চাল এবং সুন্দরবনের কাঠ না হলে কলকাতার মানুষজনের চলত না। আর এই দুই প্রয়োজনের তাগিদে ইংরেজরা অনুভব করলো একটি সংক্ষিপ্ত ও সহজ পথ বের করার। নদীপথে এই সহজ পথ বের করলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল উইলিয়াম টলি। মিলিটারিতে কাজ করতেন টলি সাহেব। তিনি একই সঙ্গে একজন ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। ১৭৬৭ সালে বেঙ্গল আর্মিতে ক্যাপ্টেন হিসেবে বদলি হওয়ার পর ১৭৮২ সালে মেজর টলি লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে উন্নীত হন। তিনি সরকারকে প্রস্তাব দেন যে মজে যাওয়া আদি গঙ্গার শুকনো খালগুলোকে সম্পূর্ণ নিজের খরচে কাটিয়ে আসাম উপত্যকার ও পূর্ববঙ্গের জেলাগুলির এবং ২৪ পরগনায় সুন্দরবনের থেকে খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উৎপন্ন দ্রব্য তিনি খিদিরপুরে আনার ব্যবস্থা করবেন। সরকার টলি সাহেবের প্রস্তাবে রাজি হন। টলি সাহেবকে প্রয়োজনীয় জমির মেয়াদ, ইজারা এবং খাল দিয়ে যেসব নৌকা চলাচল করবে তাদের কাছ থেকে টোল আদায় করার অধিকার দেন। শুধু তাই নয় খালের ধারে একটি গঞ্জ বা বাজার বসার অনুমতি দেন। আর টলি সাহেব এই বাজার বসিয়েছিলেন বলে তাঁর নাম থেকেই জায়গার নাম হয়ে যায় টলিগঞ্জ এবং তার থেকেই কালক্রমে নাম হয়ে দাঁড়ায় ‘টালিগঞ্জ’। টলি সাহেব ১৭৭৫ সালে এই খাল কাটতে শুরু করেন এবং ১৭৭৭ সালে নৌকা চলাচলের জন্য উপযুক্ত করে দেন। টলি সাহেব এই কাজে হাত দেওয়ার আগে আদিগঙ্গার খালকে কেটে চওড়া ও গভীর করেন এবং আরেকটি নতুন খাল খনন করে আদি গঙ্গার এই ৮মাইল খালের সঙ্গে যোগ করেন। হেস্টিংস থেকে শামুকপোতা বা তর্দা বন্দরে গিয়ে বিদ্যাধরী নদী পর্যন্ত। ১৭ মাইল লম্বা এই খালটিকে বলা হয় টলির নালা। এই নাম হওয়ার আগে হেস্টিংস থেকে গড়িয়া পর্যন্ত পুরানো যে খাল ছিল তাকে বলা হত ‘সারম্যান সাহেবের নালা’। আগে একবারে প্রথম দিকে এটি ‘গোবিন্দপুর খাল নালা’ নামে পরিচিত ছিল। টলি সাহেবকে সরকার যে নৌকোর ওপরে টোল আদায় করার ইজারা দিয়েছিলেন তা ছিল মাত্র ১০ বছরের জন্য কিন্তু উইলিয়াম টলি ১৭৮৪ সালে মারা যাওয়ার পর তার পত্নী আনা মারিয়া উইলকিনস নামে এক ব্যক্তিকে তার পক্ষে কর আদায়ের অনুমতি দেন। ইজারার দেওয়ার এবং এই ব্যবস্থা সন্তোষজনক না হওয়ায় ১৮০৪ সালে সরকার নিজেই এর ভার নেন এবং পরে ২৪পরগনা জেলার কালেক্টারের তত্ত্বাবধানে এটি অর্পণ করেন। টলি সাহেবের বসানো এই বাজার কোথায় ছিল তা নিয়ে যদিও গবেষকদের মধ্যে নানান মতভেদ রয়েছে। ‘কলকাতা দর্পণে’র গ্রন্থকার রাধারমন মিত্র জানিয়েছেন, “যেখানে খিদিরপুর ডক থেকে বোট ক্যানেল টালির নালায় পড়েছে তার ঠিক দক্ষিনে বজবজ রেল লাইনের ওপর দিয়ে চলে গেছে আরও কিছুটা দক্ষিণে টলির নালার পূর্ব পাড়ে এই গঞ্জ ছিল। যার থেকে পূর্ব-পশ্চিম সমস্ত অঞ্চলটার নাম হয়েছে টালিগঞ্জ কিন্তু সেই গঞ্জ বহুদিন আগে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।”

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.